অপেক্ষাকৃত বড় প্রাণীর শরীরে কোষসংখ্যাও অনেক বেশি। ইঁদুরের তুলনায় মানুষে কিংবা মানুষের চেয়ে নীল তিমিতে কোষের সংখ্যা কয়েক ট্রিলিয়ন বেশি হয়ে থাকে। যেহেতু কোষসংখ্যা বেশি, স্বাভাবিকভাবে মাইটোসিস কোষবিভাজনের পরিমাণও বেশি। এই মাইটোসিস কোষ বিভাজনের ফলেই তো এত বড় বড় শরীরের সৃষ্টি। একটা কোষ থেকে দুইটা, দুইটা থেকে চারটা, চারটা থেকে আটটা, এভাবে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন দেহকোষের জন্ম!
এখন, ক্যান্সার মূলত অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস বিভাজনের ফলাফল যার কারণ কোষের ডিএনএ প্রতিলিপনের সময় হওয়া ভুল চুক, এর নাম মিউটেশন। তাহলে সাধারণ যুক্তি কী বলে? বড় শরীর, অধিক জীবনকাল, বেশি কোষ, বেশি বেশি প্রতিলেপন, বেশি বেশি মিউটেশন, ক্যান্সারের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে যে প্রাণী যত বড় আকারে, তার ক্যান্সার সৃষ্টির পরিমাণও তত কম তুলনামূলকভাবে। রিচার্ড পেটো ৭০ দশকের শেষে এই ঘটনা প্রথম লক্ষ্য করেন। ইঁদুরের তুলনায় মানুষ, মানুষের তুলনায় হাতি কিংবা নীল তিমিতে ক্যান্সার হওয়ার পরিমাণ অনেক কম। এই বৈপরীত্যের নাম দেওয়া হয় পেটোর প্যারাডক্স। কিন্তু এই বৈপারিত্যের কারণ কী?
একগাদা ল্যাব এক্সপেরিমেন্ট থেকে দেখা যায়, বড় প্রাণীগুলোর শরীরের ডিএনএ রিপেয়ার করার কৌশল অনেক বেশি সুনিপুণ মানুষ কিংবা তুলনামূলক ছোট দেহের প্রাণীর তুলনায়৷ যেমন তিমির কথাই চিন্তা করা যায়। তিমির দেহে মিউটেশন অনেক বেশি বেশি মিউটেশন ঘটলেও সেই মিউটেশন নামক ভুলত্রুটি প্রায় পুরোপুরি শুধরে নিতে পারে এদের কোষ। এই সাফল্যের পিছনে দায়ী CIRBP নামক প্রোটিন৷ উক্ত প্রোটিন নিঃসরণের পরিমাণ বড় প্রাণীতে তুলনামূলক অনেক অনেক বেশি হওয়ায় তাদের ভুল ত্রুটি সংশোধনের হারও বেড়ে যায়। এটি পেটোর কূটাভাসের একটি সমাধান যার সাহায্যে মানবশরীরে ক্যান্সার প্রতিরোধ বাড়ানো সম্ভব ভবিষ্যতে। এরকম আরও সমাধান রয়েছে।
সম্ভাব্য আরেকটি সমাধান হলো হাতির শরীরের TP53 জিন। মানুষের শরীরে এই জিনের মাত্র এক কপি উপস্থিত যেখানে হাতির শরীরে প্রায় ২০ কপি TP53 উপস্থিত। এই জিন সেইসব সুপরিচিত জিনদের মধ্যে একটা যারা ক্যান্সার নিরোধ করে। এই জিনকে “গার্ডিয়ান অফ দ্যা জিন” নামেও সম্বোধন করা হয় যেটা হাতির শরীরের ক্যান্সার কোষকে নির্মুল করতে যোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। অনেক প্রাণীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত ক্যান্সার সৃষ্টি হওয়ার আগেই অ্যাবনরমাল কোষগুলো ধ্বংস করে ফেলে যেগুলো পরবর্তীতে ক্যান্সারের কারণ হলেও হতে পারতো।
বড় প্রাণীদের শরীরে কোষের পরিমাণ আর কোষ ভিভাজনের পরিমাণ অনেক বেশি হলেও মেটাবলিজমের হার তূলনামূলক কম। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে কতগুলো কোষ বিভাজিত হচ্ছে সেটা হিসাব করলে সংখ্যাটা আহামরি অনেক বড় না। এটাও একটা কারণ অপেক্ষাকৃত বড় প্রাণীগুলোতে যে হারে ক্যান্সার হওয়ার কথা সে হারে হতে দেখা যায় না। এই যে কারণগুলো আলোচনা করলাম, এগুলোই ভাবিষ্যতে ক্যান্সার প্রতিরোধে মানবজাতিকে অনেকখানি পথ দেখাবে। এই যেমন হাতির শরীরে থাকা একাধিক TP53 জিন যে প্রক্রিয়ায় ক্যান্সার নিরাময় করে সেই প্রক্রিয়া মানবশরীরেও ঘটানো গেলে কেমন হবে? ভবিষ্যৎ বলে দিবে তার উত্তর।


