বাংলা ভাষাভাষী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন প্রায় সাত কোটি। প্রতিদিন এই বিশাল জনগোষ্ঠী সোশ্যাল মিডিয়া, নিউজ পোর্টাল, ইউটিউব কিংবা মেসেঞ্জার গ্রুপে ডুবে থাকে অসংখ্য তথ্যের স্রোতে। কিন্তু সেই স্রোতের বড় অংশই নির্ভরযোগ্য নয়—মিথ্যা, বিকৃত বা অর্ধসত্য তথ্যের বন্যায় আমরা প্রায়ই দিশেহারা হয়ে পড়ি।
শুধু গত ২০২৫ সালের মার্চ মাসেই, বাংলাদেশের স্বনামধন্য ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার শনাক্ত করেছে ২৯৮টি ভুয়া তথ্য। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ডিজিটাল দুনিয়ায় গুজব ছড়ানোর গতি কতটা ভয়াবহ এবং প্রতিদিন আমাদের কতটা সতর্ক থাকতে হয়।
তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বাংলা ভাষায় ফ্যাক্টচেকিং নিয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা হাতে গোনা। যে কয়টি আছে, তাদের কার্যক্রমও সীমিত; কারণ সেখানে সবকিছু নির্ধারিত হয় আগে থেকেই। ব্যবহারকারী নিজে কোনো নতুন দাবি বা খবর যাচাই করতে পারেন না। অথচ তথ্যযুদ্ধের এই যুগে প্রতিটি নাগরিকের হাতে থাকা উচিত সত্য যাচাইয়ের ক্ষমতা।
এই সীমাবদ্ধতা ভাঙতেই জন্ম নিয়েছে https://www.khoj-bd.com অর্থাৎ “খোঁজ”, বাংলা ভাষার প্রথম এবং সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ এআই-চালিত ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্ম। “খোঁজ”-এর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এখানে ফ্যাক্টচেকার কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, ফ্যাক্টচেকার আপনি নিজেই।

ভাবুন একদিন আপনি হঠাৎ অনলাইনে এমন একটি খবর দেখলেন, যা কোনো বড় সংবাদমাধ্যমে নেই, কিন্তু ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার আর কমেন্ট দেখে মনে হচ্ছে খবরটি সত্যি হতে পারে। খবরটি এমন — “বাংলাদেশের নিঝুম দ্বীপ নাকি বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে চীনের কাছে”। এমন বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে খোঁজ হতে পারে আপনার নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্লেষণ করে বের করবে মূল উৎস, যাচাই করবে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, এবং উপস্থাপন করবে আপনারই মাতৃভাষায় একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট। রিপোর্টে আপনি জানতে পারবেন কোন অংশটি বিশ্বাসযোগ্য, কোন উৎস থেকে এসেছে তথ্যটি, আর কোথায় সন্দেহের জায়গা থাকতে পারে। এই ফ্যাক্টচেকিং কোনো জাদুবিদ্যা নয়, আবার এমনও নয় যে এআই সব জানে বলে আপনাকে সত্য জানিয়ে দেয়।
এর পেছনে কাজ করে শক্তিশালী প্রযুক্তি আর সুপরিকল্পিত যাচাই প্রক্রিয়া।
সংক্ষেপে বললে, প্রথমে খবরটি ঘিরে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নিউজ আর্কাইভ এবং মাল্টিমিডিয়া উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর প্রতিটি উৎসের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা হয়, প্রাসঙ্গিকতা ও ভাষাগত মিল পরীক্ষা করে টেক্সট এবং ছবির বিশ্লেষণ করা হয়। সবশেষে নির্ভরযোগ্য উৎস উল্লেখ করে স্পষ্টভাবে জানানো হয় দাবিটি সত্য, বিভ্রান্তিকর, না সম্পূর্ণ ভুল।
চলুন একটু গভীরে যাই, দেখি কীভাবে কাজ করে খোঁজের এই পূর্ণাঙ্গ কার্যপ্রণালী।

খোঁজের কার্যপ্রণালী
খোঁজের মূল ভিত্তি হলো খোঁজ টিমের তৈরি একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রযুক্তিগত কাঠামো। এই আর্কিটেকচার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এবং সেটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যাতে ব্যবহারকারী সহজেই বুঝতে পারেন। এটিকে শুধুমাত্র একটি সার্চ টুল ভাবলে ভুল হবে, কারণ এটি মূলত একটি বুদ্ধিদীপ্ত প্রক্রিয়া, যা প্রতিটি ধাপে যথাসম্ভব নিখুঁত ফলাফল দেওয়ার জন্য কাজ করে।
এখন চলুন, একে একটু বিস্তারিতভাবে জানা যাক।
(১) বিশ্বাসযোগ্য উৎসের নির্বাচিত তালিকা
খোঁজে ব্যবহৃত হয়েছে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রায় দেড় শতাধিক ওয়েবসাইটের একটি বাছাইকৃত তালিকা। এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এমন সব উৎস, যেখানে রাজনীতি, অর্থনীতি, বিনোদন, বিজ্ঞান, ধর্ম এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে প্রধান সংবাদমাধ্যম, স্বীকৃত ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা জার্নাল এবং বিশ্বস্ত স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট।
এই নির্বাচনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো তথ্যের উৎসকে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য রাখা, কারণ উৎস অবিশ্বস্ত হলে পুরো যাচাই প্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সুনির্দিষ্ট উৎসতালিকা ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে এবং তথ্যানুসন্ধানে গার্বেজ ইন গার্বেজ আউট সমস্যাকে কার্যত নির্মূল করেছে।
ফলে প্রতিটি বিশ্লেষণ ও যাচাই কেবল যাচাইকৃত ও স্বীকৃত উৎসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, যা ব্যবহারকারীর কাছে ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি করে। খোঁজের তথ্যভাণ্ডারকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে সেখানে সংরক্ষিত থাকে শুধুমাত্র প্রমাণিত, যাচাইকৃত এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য।
(২) প্রশ্নের অপটিমাইজেশন: এআই বিশ্লেষণের প্রাথমিক ধাপ
যখন কোনো ব্যবহারকারী একটি প্রশ্ন করেন, যেমন “ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে কি আলোকচিত্রী শহীদুল আলম আটক হয়েছেন?”, তখনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। এই ধাপে প্রাকৃতিক ভাষায় করা প্রশ্নটিকে রূপান্তর করা হয় আরও সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর অনুসন্ধান শব্দগুচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটিকে প্রযুক্তিগতভাবে বলা হয় “কুয়েরি পার্সিং”। উদাহরণস্বরূপ, উক্ত প্রশ্নটি রূপ নিতে পারে নিচের মতো অনুসন্ধান বাক্যেঃ
- শহীদুল আলম ইসরায়েলি বাহিনী আটক
- শহীদুল আলম গ্রেপ্তার খবর যাচাই
- ইসরায়েল বাংলাদেশ ফটোসাংবাদিক শহীদুল আলম
- শহীদুল আলম আটক সত্য না গুজব
এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই কীওয়ার্ডগুলোর সঙ্গে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম ও ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্মের নাম সংযুক্ত করে অনুসন্ধানকে আরও নির্ভুল করে তোলে। এআই সিস্টেমকে এই ধাপে বিশেষভাবে নির্দেশনা দেওয়া থাকে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর সার্চ টার্ম শনাক্ত করতে, যাতে অপ্রয়োজনীয় বা বিভ্রান্তিকর ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এর ফলে যাচাইয়ের গতি ও নির্ভুলতা দুই-ই বৃদ্ধি পায় এবং অনুসন্ধান ফলাফল সরাসরি মূল প্রশ্নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
এই ধাপটি সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনের তুলনায় খোঁজকে অনন্য করে তোলে, কারণ এখানে ব্যবহারকারীর প্রশ্নটি একপ্রকার “টার্গেটেড সার্চ সিগন্যাল”-এ পরিণত হয়, যা সঠিক উৎসে দ্রুত পৌঁছাতে সক্ষম করে।
(৩) ওয়েব ক্রলিং এবং ফিল্টারিং
প্রথম ধাপে ব্যবহারকারীর দেওয়া প্রশ্নটি কুয়েরি পার্সিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছোট, কার্যকর কীওয়ার্ডে রূপান্তরিত হয়। এরপর এই কীওয়ার্ডগুলোর ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু হয় পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসযোগ্য উৎসতালিকা থেকে। এই ধাপে ব্যবহৃত হয় একটি ওয়েব ক্রলিং পাইপলাইন, যা প্রতিটি ওয়েবসাইটের HTML DOM স্ট্রাকচার স্ক্যান করে প্রয়োজনীয় তথ্য যেমন শিরোনাম, মেটা ট্যাগ এবং মূল বিষয়বস্তু সংগ্রহ করে।
ওয়েব ক্রলিং বলতে বোঝায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘুরে ঘুরে প্রাসঙ্গিক তথ্য আহরণ করা। অন্যদিকে, DOM স্ট্রাকচার হলো একটি ওয়েবপেজের ভেতরের লেখাগুলোর সংগঠন এবং ট্যাগের কাঠামো, যা থেকে বোঝা যায় কোন অংশে কী ধরনের তথ্য রয়েছে। সংগৃহীত ডকুমেন্টগুলো পরবর্তী ধাপে একটি ওয়েটেড স্কোরিং অ্যালগরিদমের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। এই অ্যালগরিদমে প্রতিটি উৎসকে নির্দিষ্ট কিছু ওজন (weight) প্রদান করা হয়, যা নির্ধারণ করে কোন তথ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনটি তুলনামূলক কম প্রাসঙ্গিক।
এই স্কোরিং প্রক্রিয়ায় সাধারণত তিনটি প্রধান সূচক ব্যবহৃত হয়
- ক) রিসেন্সি স্কোর: এই সূচক একটি কনটেন্ট কতটা সাম্প্রতিক তা নির্ধারণ করে। টাইমস্ট্যাম্প বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন ও পুরনো ডেটা আলাদা করা হয়, যাতে সাম্প্রতিক তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায়।
- খ) অথরিটি স্কোর: এই স্কোর নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট কতটা বিশ্বাসযোগ্য। ডোমেইন অথরিটি, পেজর্যাঙ্ক এবং অন্যান্য ট্রাস্ট সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে প্রতিটি উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতার মান নির্ধারণ করা হয়।
- গ) কীওয়ার্ড ম্যাচ স্কোর: এই সূচক মূল্যায়ন করে একটি ডকুমেন্টে নির্দিষ্ট কীওয়ার্ড কতবার এসেছে এবং কতটা প্রাসঙ্গিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় টিএফ-আইডিএফ (Term Frequency–Inverse Document Frequency) পদ্ধতি, যা নির্ধারণ করে টেক্সটের কোন অংশে কীওয়ার্ডের উপস্থিতি তথ্যগতভাবে সবচেয়ে অর্থবহ।
এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খোঁজ নিশ্চিত করে যে, প্রতিটি ফলাফল সাম্প্রতিক, নির্ভরযোগ্য এবং প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতার দিক থেকে যথাযথভাবে ফিল্টার করা হয়েছে।
ওয়েটিং রুল (Weighting Rule): কোন তথ্যের ওজন কত
সব উৎস কিন্তু সমান নয়। এআই এখানে একটা “ওয়েটিং রুল” ব্যবহার করে, মানে কোন তথ্যকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে সেটা নির্ধারণ করে। ধরো, যদি “শহীদুল আলম আটক” এই প্রশ্নে কোনো নিউজের শিরোনামেই ঠিক এই শব্দগুলো মেলে, যেমন “ইসরায়েলি বাহিনির হাতে ফটোসাংবাদিক শহীদুল আলম আটক” — তাহলে সেটাকে সর্বোচ্চ ওজন দেওয়া হয়। আর যদি একই তথ্য শুধু বডি টেক্সটে (মূল লেখায়) কোথাও উল্লেখ থাকে, তাহলে তুলনামূলকভাবে কম ওজন পায়।
এভাবে প্রতিটি উৎসের শিরোনাম, বডি টেক্সট, প্রকাশের তারিখ, ওয়েবসাইটের নির্ভরযোগ্যতা সব মেট্রিক মিলিয়ে একটা কম্পোজিট স্কোর (Composite Score: 0–1) বের করা হয়। এই স্কোর যত বেশি, উৎসটা তত বেশি প্রাসঙ্গিক ও নির্ভরযোগ্য।
শেষে সবচেয়ে ভালো স্কোর পাওয়া ৮–১১ টি উৎসকে JSON ফরম্যাটে সংরক্ষণ করা হয়। যারা জানেন না, JSON হলো এমন একটা ফরম্যাট যা কম্পিউটার খুব সহজে পড়তে, সংরক্ষণ করতে, আর পরে ব্যবহার করতে পারে। এই ছাঁটাই প্রক্রিয়াটা এতটাই সূক্ষ্মভাবে কাজ করে যেন একদম খড়ের গাদার ভেতর থেকে সোনার সুই খুঁজে আনে অপ্রাসঙ্গিক ও বিভ্রান্তিকর ফলাফল বাদ দিয়ে শুধু সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, সাম্প্রতিক আর প্রাসঙ্গিক উৎসগুলো রাখে।
(৪) ফলব্যাক অনুসন্ধান
প্রাথমিকভাবে অনুসন্ধান সীমাবদ্ধ থাকে কিউরেটেড উৎসগুলোর মধ্যে। তবে যদি এমন কোনো দাবি আসে যা অত্যন্ত নতুন বা অস্বাভাব্য, তখন সেই উৎসগুলোর মধ্যে মিল পাওয়া নাও যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে ফলব্যাক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। এখানে ব্যবহৃত হয় একটি বিশেষ টুল, যেমন ট্যাভিলি এপিআই — যা পুরো ওয়েব-স্পেস স্ক্যান করে, তবে শুধুমাত্র বিশ্বস্ত ও অথেন্টিক সাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে।
ফলব্যাক প্রক্রিয়ায় একটি স্মার্ট অথরিটি স্কোরিং সিস্টেম কাজ করে, যা নিশ্চিত করে যাতে ভুয়া বা অপ্রাসঙ্গিক লিংক ফলাফল তালিকায় প্রবেশ করতে না পারে। এছাড়া ট্যাভিলি এপিআই-তে বিভিন্ন ব্যাকআপ ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে যদি কোনো একটি উৎস সাময়িকভাবে কাজ না করে বা রেট লিমিট অতিক্রম করে, তখন অন্য উৎস সক্রিয় হয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত থাকে।
এই প্রক্রিয়ার ফলে, প্রশ্ন যতই জটিল বা নতুন হোক না কেন, “খোঁজ” একটি নিরাপদ তথ্য খোঁজার মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। এই ফলব্যাক ব্যবস্থা খোঁজের সঠিকতার হার প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত রাখে, যা অনেক আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্মের তুলনায় উল্লেখযোগ্য।
(৫) রিপোর্ট জেনারেশন
সব তথ্য সংগ্রহের পর অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হয় না। খোঁজের এআই এগুলোকে সাজিয়ে তৈরি করে একটি সহজবোধ্য, পড়তে আরামদায়ক এবং প্রাঞ্জল বাংলায় একটি রিপোর্ট। এই প্রক্রিয়ায় তিন-স্তরের ফলব্যাক সিস্টেম ব্যবহার করা হয়, যা প্রাইমারি থেকে টারশিয়ারি পর্যায় পর্যন্ত কাজ করে এবং সম্ভাব্য ভুলের সুযোগ কমিয়ে আনে।
রিপোর্টে পাওয়া যায়:
- কোন উৎস বা সাইট কী তথ্য দিয়েছে
- তথ্যগুলোর মধ্যে কোথায় মতপার্থক্য আছে
- প্রেক্ষাপট
- যুক্তি-প্রমাণ
- এবং শেষ পর্যন্ত দাবিটা সত্য, মিথ্যা নাকি বিতর্কিত
এখানেই দেখা যায় এআই-এর মূল কার্যক্ষমতা। প্রথমে এটি প্রশ্নটিকে অপটিমাইজ করে, যাতে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ও সঠিক তথ্য সনাক্ত করা যায়। এরপর সংগৃহীত ফলাফলগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয় যেন একটি বোধগম্য গল্প বলা হচ্ছে, পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিকতা বজায় থাকে। প্রতিটি রিপোর্টে উৎসের লিঙ্ক দেওয়া থাকে, যাতে ব্যবহারকারী চাইলে নিজেরাই যাচাই করতে পারেন। ফলস্বরূপ, অভিজ্ঞতাটি হয় এমন, যেন একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বসে তথ্য আলোচনা করা হচ্ছে সহজ, নির্ভরযোগ্য এবং খুবই বিশ্বাসযোগ্য।

বিশেষায়িত ফিচারসমূহ
খোঁজকে বাংলা ভাষায় সত্য যাচাইয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এআই ফ্যাক্টচেকিং ছাড়াও আরও কিছু বিশেষ ফিচার সংযোজন করা হয়েছে।
এআই মিথবাস্টিং
ডিজিটাল যুগে ভুয়া খবর ও গুজব দৈনন্দিন তথ্যপথে সহজলভ্য। অনেক সময় ব্যবহারকারীরা শুধু “কোনো দাবি সত্য না মিথ্যা” এই সীমিত জবাবেই সন্তুষ্ট থাকেন। খোঁজের এক বিশেষ ফিচার হলো এটি কেবল সিদ্ধান্ত দেয় না, বরং ব্যবহারকারীর জন্য বিষয়টি ব্যাখ্যা করে।
যেকোনো কুসংস্কার বা বৈজ্ঞানিক দাবির ক্ষেত্রে এআই তথ্যের প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করে, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং প্রাসঙ্গিক উৎস প্রদর্শন করে, এবং বিষয়টির অথেন্টিসিটি গল্পের মতো করে বিশ্লেষণ করে। উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয় স্বীকৃত ওয়েবসাইট এবং পিয়ার রিভিউড জার্নাল। এটার কার্যপদ্ধতিও অনেকটা খোঁজ এর মূল ফিচার, এআই ফ্যাক্টচেকারের মতোই। এই ফিচারের মূল লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীর ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। দীর্ঘমেয়াদে এটি তথ্য যাচাই এবং গুজব শনাক্ত করার দক্ষতা গড়ে তোলে, যা ডিজিটাল তথ্যপরিবেশে নিরাপদ ও কার্যকর অন্বেষণ নিশ্চিত করে।
রিভার্স মিডিয়া সার্চ
এ ফিচারটা অনেকটা গুগল লেন্সের মতো। তবে আরেকটু বেটার। ছবি আপলোড করে জানতে পারবেন আপনার আপলোডকৃত ছবিটি ইন্টারনেটে আর কোথায় কোথায় আছে। এতে করে কোনো নির্দিষ্ট ছবি নিয়ে গুজব ছড়ালেও খোঁজের সাহায্যে আপনি বের করে ফেলতে পারবেন, মূল ছবিটি আসলে কীসের ছিলো, কোন প্রেক্ষাপটে ছিলো। ফাইল আপলোডের জন্য রয়েছে সহজ ড্র্যাগ-এন্ড-ডপ ইন্টারফেস এবং সার্চের অগ্রগতি সরাসরি দেখার সুযোগ।
লেখা যাচাই
এই টুলের সাহায্যে যেকোনো বাংলা লেখা সহজেই বিশ্লেষণ করা যায়। এটি ডুপ্লিকেট কনটেন্ট বা প্লেজিয়ারিজম শনাক্ত করতে সক্ষম এবং কোনো লেখা মানুষের লেখা নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি—তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে পারে। পাশাপাশি লেখার পাঠযোগ্যতা এবং এর মূল উৎস সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে।
খোঁজ চ্যাট
খোঁজ-এর অন্যতম কাজের একটি ফিচার হচ্ছে, এই “খোঁজ চ্যাট”। খোঁজ চ্যাটে তিনটি বিশেষায়িত ফিচার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
- এর মধ্যে প্রথমটি হলো “জেনারেল মোড“, যেখানে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য যাচাইও করতে পারেন।
- তথ্য যাচাইয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট অপশন রাখা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীকে চ্যাটের মধ্যে সরাসরি ফ্যাক্টচেক করার সুবিধা দেয়, এর নাম দেয়া হয়েছে “যাচাই“। এই মোডে চ্যাটবট প্রদান করে সংক্ষেপে উত্তর এবং সেই সঙ্গে তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎসগুলোও নির্দেশ করে, যাতে ফলাফলের প্রমাণযোগ্যতা নিশ্চিত হয়।
- তৃতীয় ফিচারটি হলো নাগরিক সেবা সম্পর্কিত তথ্য প্রদানের ব্যবস্থা, নামও “নাগরিক সেবা“। এই ফিচারের মাধ্যমে ব্যবহারকারী সরকারি সেবা, যেমন নাগরিক পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট এবং আইনী সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে সরাসরি তথ্য জানতে পারেন। পূর্বে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে ব্যবহারকারীকে অনেক সময় ব্যয় করতে হতো, যেমন গুগল বা ইউটিউব অনুসন্ধান। খোঁজ চ্যাট এই প্রক্রিয়াটিকে সরল এবং সময় সাশ্রয়ী করে তোলে।
এই তিনটি ফিচারের সমন্বয় ব্যবহারকারীর জন্য তথ্য অনুসন্ধান ও যাচাইকে সহজ, দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য করে তোলে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থার মধ্যে স্বচ্ছতা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধ কর্নার – লিবারেশন ওয়ার ইঞ্জিন
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ইন্টারনেটে নানান গুজব রটে প্রায়ই। একই সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নিজস্ব ন্যারেটিভে বিকৃত হয়ে যায় নানান ঐতিহাসিক ঘটনা। সেসবই মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। এটা থেকে উত্তরণে আছে আমাদের “মুক্তিযুদ্ধ কর্নার”।
গুগল থেকে কেন এটা আলাদা, সেটা বলা যাক। গুগলে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাপারে জানতে চাইলে ঠিক-ভুল, সবই রেজাল্ট আকারে সামনে আসবে। কিন্তু খোঁজ-এর এই মুক্তিযুদ্ধ কর্নার একটু ভিন্ন। এটা আপনাকে সবচেয়ে অথেন্টিক আর পক্ষপাতহীন ফলাফল এনে দেবে। একাত্তরে সংঘটিত হওয়া গণহত্যা, ধর্ষণ, যুদ্ধাপরাধ ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে এই ফিচারটা বেশ কাজের।
খোঁজ টিমের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে, এ অংশটিতে পূর্ণরূপে Retrieval Augmented Generation প্রযুক্তির প্রয়োগ করা। এ পদ্ধতিতে, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়া হবে মুক্তিযুদ্ধের দলিল, গবেষণামূলক গ্রন্থ, ঐতিহাসিকগণদের লিখা বইপত্র থেকে। যেসব ডেটার উপর বৃহৎ ভাষা মডেলগুলো ট্রেইনড না বা যেসব তথ্য গুগল করেও জানা সম্ভব না, বইপত্র পড়া ছাড়া, সেসব তথ্যই ব্যবহারকারীকে খোঁজ এনে দেবে কেবল তাদের একটা প্রশ্নে।
ম্যানুয়াল ফ্যাক্টচেকিং
এআই-ভিত্তিক ফিচারের পাশাপাশি খোঁজ টিম নিয়মিতভাবে অনলাইনে ছড়ানো বিভিন্ন গুজব ম্যানুয়ালভাবে যাচাই করে, খোঁজের ফ্যাক্টচেকিং টুল গুলো ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো বিভ্রান্তিকর বা ভুয়া তথ্য দ্রুত শনাক্ত করা এবং ছড়ানো রোধ করা। মানুষের বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংমিশ্রণ ব্যবহার করে, খোঁজ একটি নির্ভরযোগ্য সত্য যাচাইয়ের মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে।
এই ম্যানুয়াল ফ্যাক্টচেকিংয়ের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজব ও ভুল তথ্য খন্ডন করা হয় এবং তা খোঁজের মূল পৃষ্ঠায় প্রকাশিত থাকে, যা ব্যবহারকারীদের জন্য স্বচ্ছতা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে।
সীমাবদ্ধতা
কোনো তথ্য যাচাই ব্যবস্থাই সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়। উৎসের তালিকা যত বিস্তৃত হোক, তার বাইরে থাকা কোনো খবর বাদ পড়তে পারে, যা সোর্স বায়াসের একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। এছাড়া রিয়েল-টাইম আপডেট না থাকলে সামান্য সময়গত বিলম্ব ঘটতে পারে। এআই-ভিত্তিক সারাংশ কখনো কখনো সূক্ষ্ম ভুল করতে পারে, তাই সবসময় মূল সোর্স লিঙ্ক যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
ডিজিটাল তথ্যপরিবেশে গুজব, ভুয়া খবর এবং অর্ধসত্যের বিস্তার প্রতিদিনকার বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে, তথ্য যাচাইয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য এবং কার্যকর পদ্ধতির প্রয়োজন অপরিহার্য। খোঁজ প্ল্যাটফর্মটি এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তি এবং মানব বিশ্লেষণকে সংমিশ্রিত করে একটি সমন্বিত তথ্য যাচাই ব্যবস্থা প্রদান করে।
এর কার্যপ্রণালীতে কিউরেটেড উৎস তালিকা, প্রশ্ন অপটিমাইজেশন, ওয়েব ক্রলিং ও ফলব্যাক অনুসন্ধান, রিপোর্ট জেনারেশন এবং বিশেষায়িত চ্যাট ফিচার অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, নিয়মিত ম্যানুয়াল ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্মটিকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলে।
যদিও কোনো সিস্টেমই সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়, এই সংমিশ্রিত প্রক্রিয়া ব্যবহারকারীর জন্য তথ্য যাচাইকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং এবং ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সহায়ক, যা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
সত্যান্বেষের এ যাত্রায় যোগ দিতে পারেন খোঁজের সাথেঃ https://www.khoj-bd.com/


