কোনো ঘটনা যদি ঘটার অনেকদিন পরেও নিজের জানান দেয়, সেই ঘটনার প্রচুর চিহ্ন থেকে যায় তবে বুঝতে হবে ঐ ঘটনা শুধুমাত্র বৃহৎ এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিলো না; বরং ঐ ঘটনার প্রবাহ এখনো চলমান। হতে পারে সেটা এখনও ঘটছে কিন্তু আমাদের চামড়ার চোখে সেটা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। আজকের গল্পটা একটা চিহ্ন নিয়ে, ঐ যে বললাম, বৃহৎ ঘটনার থেকে যাওয়া চিহ্ন। আজকের গল্পটা জীবের এলোপাথাড়ি নকশার।
আমাদের মস্তিষ্ক থেকে সৃষ্টি হওয়া ১২ জোড়া করোটিক স্নায়ুর একটি উল্লেখযোগ্য স্নায়ু হচ্ছে ভেগাস স্নায়ু। এটি মেডুলা অবলংগাটার পার্শ্বদেশ থেকে সৃষ্টি হয়েছে, প্রতিটি ভেগাস স্নায়ু চারটি শাখায় বিভক্ত হয়। এই চারটি শাখার একটি শাখা হচ্ছে ল্যারিঞ্জিয়াল স্নায়ু। যার কাজ হচ্ছে স্বরযন্ত্রের পেশী সমূহ পরিচালনা করা। স্বরযন্ত্র পরিচালিত হয় সুপিরিয়র ল্যারিঞ্জিয়াল স্নায়ু ও পূণরাবৃত্তি (recurrent) ল্যারিঞ্জিয়াল স্নায়ুর মাধ্যমে। ল্যারিঞ্জিয়াল স্নায়ুর উৎপত্তিস্থল থেকে স্বরযন্ত্র বা স্বরযন্ত্রের দূরত্ব মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার। সুপিরিয়র ল্যারিঞ্জিয়াল স্নায়ু যেটা স্বরযন্ত্রের একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করে- ভেগাস স্নায়ু হতে বেরিয়ে সোজা পথে চলে গেছে স্বরযন্ত্রে। আরেকটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে পুনরাবৃত্তিক ল্যারিঞ্জিয়াল স্নায়ু। আমাদের আজকের গল্পের নায়ক এই পুণরাবৃত্তিক বা রেকারেন্ট ল্যারিঞ্জিয়াল স্নায়ু।
কেবল যে বললাম এই স্নায়ুর উৎপত্তিস্থল থেকে স্বরযন্ত্রের দূরত্ব কয়েক সেন্টিমিটার এ থেকে আপনাদের মনে হতে পারে, “বাহ, এতো ছোটপথ, পুনরাবৃত্তিক ল্যারিঞ্জিয়াল স্নায়ু কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা হলেই স্বরযন্ত্রের নাগালে চলে আসবে।” কিন্তু, এমনটা না। আপনাদের অবাক করে দেওয়ার মতো কথা হচ্ছে, এটি সোজাপথে স্বরযন্ত্রে না গিয়ে গলা বেয়ে নীচের দিকে নামতে থাকে। নামতে নামতে হৃৎপিন্ডের মহাধমনীর (Aortic Arc) নিচ দিয়ে গিয়ে আবার ইউ টার্ন দিয়ে গলা বেয়ে উপরে উঠতে থাকে এবং এক পর্যায়ে গিয়ে স্বরযন্ত্রের নিম্নাংশে যুক্ত হয়। পৃথিবীর প্রায় সব টেট্রাপডের দেহেই এমন নজির আছে। জিরাফের ক্ষেত্রে এই অযথা ঘুরে আসার পথটা আরও দীর্ঘ। সেক্ষেত্রে জিরাফের শরীরে থাকা এই স্নায়ুটি (RLN) মাত্র চার ইঞ্চির পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অযথাই পাড়ি দিলো ১৫ ফুট (বা ৪.৬ মিটার) লম্বা দূরত্ব।
জীবাশ্মবিদ ম্যাথিও ওয়েডেল সরোপডদের RLN এর পাড়ি দেওয়া পথের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করেন। তিনি দেখান যে সরোপডদের বেলায় RLN কে নিজের গন্তব্যে পৌছাতে পাড়ি দিতে হয়েছিলো প্রায় ২৮ মিটার লম্বা দূরত্ব। এবার প্রশ্ন আসে, কেনো RLN মাত্র কয়েক সেন্টিমিটারের পথ সোজাসুজি না গিয়ে এতো লম্বা পথ অযথাই ঘুরে আসলো? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে কোটি বছর আগে। ঠিক যখন আমাদের সব টেট্রাপডদের পূর্ব-পুরুষ ছিলো মাছ আকৃতির। সেই প্রাচীন মাছের ব্যবচ্ছেদ করে এবার আমরা স্বাক্ষী হবো এক ঐতিহাসিক ঘটনার।
মাছের হৃৎপিন্ড দুই কক্ষ বিশিষ্ট। এটা ভেন্ট্রাল অ্যাওর্টা নামক একটা কেন্দ্রীয় ধমনীর মধ্য দিয়ে রক্ত প্রবাহিত করে। এই ভেন্ট্রাল এওর্টা থেকে ছয়টি রক্তনালী বেরিয়ে ছয়টি ফুলকার মধ্য দিয়ে গিয়ে যুক্ত হয় আরেকটি বড় ধমনীর সাথে, যার নাম ডর্সাল এওর্টা। ডর্সাল এওর্টার ঠিক উপরেই অবস্থিত মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে আসা চারটি স্নায়ু। তন্মধ্যে চতুর্থ স্নায়ুটি হচ্ছে আমাদের আজকের নায়ক, রেকারেন্ট লরিঞ্জিয়াল স্নায়ু। এটি ডর্সাল এওর্টা ও ষষ্ঠ ফুলকার মধ্য দিয়ে গিয়ে যুক্ত হয়েছে ষষ্ঠ স্বরযন্ত্রের সাথে। প্রাচীন স্বরযন্ত্র মূলত কাজ করতো একটা সাধারণ স্ফিংকটার হিসেবে । যেটা নিম্ন বায়ুপথকে বহির্গত কোনোকিছুর অনুপ্রবেশ থেকে রক্ষা করতো। আজকের দিনে সেই স্ফিংকটার টেট্রাপডদের স্বরযন্ত্র হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে।
আমদের সেই পূর্বপুরুষ, মাছ-জাতীয় প্রাণির কোনো গলা ছিলো না। তাই তার ভেগাস স্নায়ু থেকে RLN বেরিয়ে সোজাসুজি স্বরযন্ত্রে যুক্ত হয়েছে। তাই তার গতিপথ ছিলো সোজা এবং তার দেহের জন্য যথার্থ। কিন্তু, বিবর্তনের ধারায় টেট্রাপডদের হৃদপিণ্ড নীচে চলে যাওয়া ও মস্তিষ্ক সহ ঘাড় উপরে চলে আসায় এই ল্যারিঞ্জিয়াল নার্ভকে হৃৎপিণ্ড হয়ে স্বরযন্ত্রে যুক্ত হতে অপচয় করতে হয় অনেকখানি পথ। এই অপচয় ও ত্রুটিপূর্ণ গঠন-ই নির্দেশ করে সব টেট্রাপডদের একক অতীত ইতিহাসকে। নির্দেশ করে এক আশ্চর্য-সুন্দর বাস্তবতাকে। আর এই RLN যে বৃহৎ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার চিহ্ন সেটা হলো “আমাদের বিবর্তন”।
মার্কিন জীবাশ্মবিদ স্টিফেন জে গুলড এর ভাষ্যে,
“আপাত-অদ্ভুত এমন সজ্জা কেনো দেখা যায় তার হাস্যকর উত্তর হলো এগুলো বিবর্তনীয় ইতিহাসের চিহ্ন, এরূপ নকশার পথ কোনো বুদ্ধিমান স্রষ্টা নেবেন না, কিন্তু (জীবের বিবর্তনীয়) ইতিহাসের দ্বারা সীমাবদ্ধ হওয়ার কারণে প্রাকৃতিক নির্বাচন এমন পথ বেছে নিতে বাধ্য থাকে।”
আমাদের শরীরে এখনও প্রচুর চিহ্ন অবশিষ্ট রয়ে গেছে হাজার হাজার বছরের বিবর্তনের। এমন ধ্বংসাবশেষ যেমন রয়ে গিয়েছে আমাদের কোষের অভ্যন্তরের আণুবীক্ষণিক জিনে, তেমনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আমাদের সারা শরীরেও। তিকতালিকের আজকের গল্পটা ছিলো তেমনি এক অবিশিষ্ট নিদর্শনের।


