কৃত্রিম সূর্যে চীনের নতুন সাফল্য

China Fusion

চীন সম্প্রতি তাদের “কৃত্রিম সূর্য” নামে পরিচিত EAST (Experimental Advanced Superconducting Tokamak) রিঅ্যাক্টরে যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের চোখ কপালে তুলে দিয়েছে। নিউক্লিয়ার ফিউশন এমন একটি প্রযুক্তি যেখানে সূর্যের মতো শক্তি উৎপন্ন করা হয়—দুটি হালকা পরমাণু একত্রিত হয়ে একটি ভারী পরমাণু তৈরি করে এবং সেই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ শক্তি বের হয়। বহু দশক ধরে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন এই শক্তিকে পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করতে, কিন্তু পথে ছিল একের পর এক কঠিন বৈজ্ঞানিক বাধা। চীনের এই সাম্প্রতিক সাফল্য দেখিয়ে দিল যে, সেই বাধাগুলোর অনেকটাই এখন ভাঙতে শুরু করেছে।

নিউক্লিয়ার ফিউশনের মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্লাজমাকে অত্যন্ত গরম, ঘন এবং স্থিতিশীল রাখা। প্লাজমা হলো গ্যাসের এমন একটি অবস্থা যেখানে ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস আলাদা হয়ে যায়, এবং এটি অত্যন্ত অস্থির প্রকৃতির হয়। ফিউশন ঘটাতে হলে প্লাজমাকে প্রায় ১৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করতে হয় এবং একই সঙ্গে চুম্বকীয় বল দিয়ে তাকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখতে হয়, যেন তা রিঅ্যাক্টরের দেয়ালে লেগে না যায়। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা একটি বড় সমস্যার মুখোমুখি ছিলেন—প্লাজমার ঘনত্ব একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপরে গেলে তা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ত এবং রিঅ্যাকশন বন্ধ হয়ে যেত। এই সীমাকে বলা হয় “গ্রিনওয়াল্ড লিমিট”।

এই গ্রিনওয়াল্ড লিমিটই এতদিন ফিউশন গবেষণার সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ বেশি ঘনত্ব মানে বেশি জ্বালানি, আর বেশি জ্বালানি মানে বেশি সংঘর্ষ, ফলে বেশি শক্তি উৎপাদন। কিন্তু সীমা পার হলেই প্লাজমা কাঁপতে শুরু করত, রিঅ্যাক্টরের দেয়ালে ধাক্কা লাগত, আর পুরো প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ত। China’s EAST রিঅ্যাক্টরের বিজ্ঞানীরা এই সমস্যার সমাধানে এক নতুন কৌশল প্রয়োগ করেছেন। তারা প্লাজমা ও রিঅ্যাক্টরের দেয়ালের মধ্যে মিথস্ক্রিয়াকে খুব সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন, যাতে প্লাজমা দেয়ালকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে এবং নিজেও অস্থিতিশীল না হয়।

এই নতুন পদ্ধতির ফলে তারা এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছেন যাকে বলা হচ্ছে “ডেনসিটি-ফ্রি রেজিম” বা ঘনত্ব-মুক্ত স্তর। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এখন তারা আর আগের সেই তাত্ত্বিক সীমার মধ্যে আটকে নেই। তারা গ্রিনওয়াল্ড লিমিটের চেয়ে প্রায় ১.৩ থেকে ১.৬৫ গুণ বেশি ঘনত্বে প্লাজমাকে স্থিতিশীলভাবে ধরে রাখতে পেরেছেন। এটি সত্যিই যুগান্তকারী, কারণ এতদিন বিজ্ঞানীরা ভাবতেন এই সীমা ভাঙা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু EAST দেখিয়ে দিয়েছে, সঠিক নিয়ন্ত্রণ আর প্রযুক্তি থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

এই সাফল্যের অর্থ শুধু একটি বৈজ্ঞানিক রেকর্ড ভাঙা নয়, এর ভবিষ্যৎ প্রভাব অনেক গভীর। উচ্চ ঘনত্বের প্লাজমা মানে কম জায়গায় বেশি শক্তি উৎপাদন করা যাবে। ফলে ভবিষ্যতে ফিউশন রিঅ্যাক্টরগুলো আকারে ছোট হতে পারে, খরচ কমবে, এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। এতদিন ফিউশন শক্তিকে বলা হতো “৩০ বছর দূরের প্রযুক্তি”—মানে সবসময় ভবিষ্যতের কথা বলা হতো, কিন্তু বাস্তবে আসত না। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। EAST-এর এই অর্জন প্রমাণ করছে যে ফিউশন শক্তি আর শুধু পরীক্ষাগারের কল্পনা নয়, বাস্তব বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
নিউক্লিয়ার ফিউশনকে পরিবেশবান্ধব শক্তির “হলি গ্রেইল” বলা হয়। কারণ এতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নেই, পারমাণবিক ফিশনের মতো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকারক বর্জ্য নেই, এবং জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় ডিউটেরিয়াম, যা সমুদ্রের পানিতেই প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। অর্থাৎ ভবিষ্যতে শক্তির জন্য দেশগুলোকে আর কয়লা, তেল বা গ্যাসের ওপর নির্ভর করতে হবে না। শক্তি হবে পরিষ্কার, নিরাপদ এবং প্রায় অশেষ।

চীন এখানেই থামছে না। তারা ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের পরবর্তী বড় প্রকল্প CFETR (Chinese Fusion Engineering Test Reactor) সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করছে। এই রিঅ্যাক্টর প্রায় ১০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমান। EAST-এ যে প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা তারা অর্জন করেছে, তা সরাসরি CFETR নির্মাণে কাজে লাগানো হবে। অর্থাৎ EAST হচ্ছে পরীক্ষাগার, আর CFETR হবে বাস্তব দুনিয়ার দিকে বড় লাফ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চায়নার “কৃত্রিম সূর্য” শুধু একটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নয়, এটি ভবিষ্যৎ শক্তির দরজা খুলে দিচ্ছে। যে ফিউশন শক্তিকে একসময় কল্পবিজ্ঞান মনে করা হতো, আজ তা ধীরে ধীরে বাস্তবের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। EAST-এর এই সাফল্য বিশ্বকে নতুন করে আশা দেখাচ্ছে—একদিন হয়তো আমাদের বিদ্যুৎ আসবে সূর্যের মতো আগুন থেকে, কিন্তু কোনো ধোঁয়া, দূষণ বা ধ্বংস ছাড়াই।

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *