পাঁচ শতাব্দী আগে যিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, আজ বিজ্ঞান যেন আবার তার ছায়া খুঁজে পাচ্ছে—তিনি আর কেউ নন, রেনেসাঁ যুগের বিস্ময়কর প্রতিভা লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। চিত্রশিল্পী, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক—একজন মানুষ কীভাবে এত গুণের অধিকারী হতে পারেন, তা আজও বিস্ময়ের বিষয়। আর ঠিক এই মানুষটিকেই নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন এমন এক গবেষণায় নেমেছেন, যা শুনলে রীতিমতো শিহরণ জাগে—ভিঞ্চির আঁকা ছবি ও নথিপত্র থেকে তার DNA খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি সত্যিই “ভিঞ্চি ফিরে আসছেন”?
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কিছু শিল্পকর্ম ও হাতে লেখা নথির উপর থেকে অতি ক্ষুদ্র জৈবিক উপাদান সংগ্রহ করা হয়েছে, যেখানে মানব DNA-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বিশেষ করে লাল চক দিয়ে আঁকা কিছু স্কেচ এবং পুরনো কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে পেয়েছেন, সেখানে লালা, ঘাম কিংবা ত্বকের কোষের মতো চিহ্ন রয়ে গেছে। আধুনিক জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই নমুনা থেকে DNA আলাদা করার চেষ্টা চলছে। ভাবতেই অবাক লাগে—৫০০ বছর আগের একজন মানুষের শরীরের ছাপ আজও তার শিল্পে লুকিয়ে থাকতে পারে!
এই গবেষণার মূল লক্ষ্য একটাই—লিওনার্দো দা ভিঞ্চির জিনগত প্রোফাইল (genetic profile) তৈরি করা। অর্থাৎ তার DNA কেমন ছিল, তিনি কোন জিনগত গোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন, তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য কেমন হতে পারে—এসব জানার চেষ্টা। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই দা ভিঞ্চির পরিবারের পুরুষ বংশধরদের DNA পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং সেখানে কিছু মিল পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে শিল্পকর্মে পাওয়া DNA তার পরিবারের জিনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে। তবে গবেষকরা এটাও স্পষ্ট করে বলছেন, এটি এখনো চূড়ান্ত প্রমাণ নয়—কারণ শত শত বছর ধরে বহু মানুষ সেই শিল্পকর্ম ছুঁয়েছেন, ফলে অন্য কারও DNA মিশে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
এই গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো—ভবিষ্যতে যদি সত্যিই দা ভিঞ্চির DNA নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যায়, তাহলে তার সম্পর্কে অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে। তিনি কি কোনো বিশেষ জিনগত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন? তার অসাধারণ সৃজনশীলতার পেছনে কি কোনো জৈবিক কারণ ছিল? তার চোখের দৃষ্টি, মস্তিষ্কের গঠন বা স্বাস্থ্যের বিষয়ে কি বিজ্ঞান কিছু নতুন তথ্য পেতে পারে? এসব প্রশ্ন এতদিন শুধু কল্পনা আর ইতিহাসের পাতায় ছিল, এখন সেগুলো বিজ্ঞানের আলোয় যাচাই করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি কোনোভাবেই “ভিঞ্চিকে জীবিত করে তোলা” বা ক্লোন বানানোর চেষ্টা নয়। বরং এটি একধরনের জৈবিক ইতিহাস উদ্ধার। যেমন প্রত্নতাত্ত্বিকরা মাটি খুঁড়ে পুরনো সভ্যতার নিদর্শন বের করেন, তেমনি বিজ্ঞানীরা এখন শিল্পকর্মের ভেতর থেকে একজন মানুষের জীবনের জৈবিক ছাপ খুঁজে বের করতে চাইছেন। একে অনেকেই বলছেন “আর্টিওমিক্স” (Arteomics)—অর্থাৎ শিল্প ও জীববিজ্ঞানের মিলনস্থল।
তবে এই উদ্যোগ ঘিরে বিতর্কও কম নয়। অনেক ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞানী বলছেন, এত পুরনো শিল্পকর্ম থেকে পাওয়া DNA কখনোই শতভাগ নিশ্চিতভাবে ভিঞ্চির বলে প্রমাণ করা যাবে না। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ, সংরক্ষণ প্রক্রিয়া ও মানুষের স্পর্শ—সবকিছু মিলিয়ে নমুনা দূষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবুও, প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে আজ যেটা অসম্ভব মনে হচ্ছে, কাল সেটাই সম্ভব হয়ে উঠতে পারে—ইতিহাস তারই সাক্ষী।


