করপাস ক্যালোসাম ও দ্বিত্ব মস্তিষ্ক

করপাস ক্যালোসাম ও দ্বিত্ব মস্তিষ্ক

মস্তিষ্কের এই হলুদাভ সংযোগস্থলের নাম “করপাস ক্যালোসাম”। মস্তিষ্কের ছয়টি অংশের মধ্যে প্রধান একটি অংশ সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার যা দুই ভাগে বিভক্ত। বাম সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের ডান দিকের অংশ আর ডান সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার নিয়ন্ত্রণ করে বাম দিকের অংশ। এই দুই অংশের সংযোগ স্থাপন করে করপাস ক্যালোসাম। এই অংশটা না থাকলে দুই হেমিস্ফিয়ার পৃথক হয়ে যায়, পৃথকভাবে কাজ করে। তখন বাম সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ারের সাথে ডান হেমিস্ফিয়ারের কোনো তথ্যের আদানপ্রদানই হয়না।

আমাদের ভাষার প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে বাম হেমিষ্ফিয়ার। তাই ডান চোখ বন্ধ করে কেউ যখন বাম চোখ দিয়ে তাকায় তখন তার ডান সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ারে প্রতিবিম্ব গঠিত হয়। সে মস্তিষ্কের এই অংশ দিয়ে দেখতে পায় ঠিকই, কিন্তু কি দেখছে সেটা সে বলতে পারেনা, সেই তথ্য বাম হেমিস্ফিয়ারে পৌছায় না, ফলে সে তার দেখা ঘটনাগুলো ভাষায় প্রকাশ করতে পারেনা। এই সমস্যায় আক্রান্ত কোনো ব্যাক্তির বাম চোখ বন্ধ করে ডান চোখ দিয়ে কোনো সুইচ দেখিয়ে সেটা অন অফ করতে বলেন তবে তার ডান হাত আগে রেসপন্স করবে। উল্টোটা করলে উল্টোটা ঘটবে। এই বিশেষ অবস্থার নাম খন্ডিত মস্তিষ্ক, দ্বিত্ব মস্তিষ্ক বা কলোসাল সিনড্রোম।

১৯৬০ সালে দ্বিত্ব মস্তিষ্কের প্রথম কেইস সামনে আসে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে আমরা WJ নামে সম্বোধন করব। ইনি ভয়াবহ আকারে মৃগী তথা এপিলেপ্সিতে আক্রান্ত ছিলেন। তাকে নিয়ে বিস্তর গবেষণায় ডাক্তাররা দ্বিত্ব মস্তিষ্কের বেশ কিছু দিক আবিষ্কার করেন। WJ বাম চোখ দিয়ে কোনো কিছু পর্যবেক্ষণ সেটা শনাক্ত করতে পারেন না অর্থাৎ নাম বলতে পারেননা। কিন্তু ডান চোখ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করকে ঠিকই সেটার নাম বলতে পারেন তিনি। এ থেকে প্রমাণিত হয়, আমাদের ভাষা সম্পর্কিত প্রায় সকল ক্রিয়াকলাম বাম মস্তিষ্কেই ঘটে। উল্লেখ্য, WJ ডান চোখ দিয়ে কিছু দেখলে সেটা শনাক্ত করতে পারলেও বাম হাত দিয়ে আঁকাতে পারতেন না।

আরও একটা কেইসে একই ফলাফল পাওয়া যায়। PS নামক জনৈক দ্বিত্ব মস্তিষ্কে আক্রান্ত ব্যক্তির দুই হাতে দুইটি ভিন্ন বস্তু দেওয়া হয়। ডান হাতে দেওয়া হয় কাঁটা চামচ এবং বাম হাতে দেওয়া হয় সাধারণ চা চামচ। তিনি ডান হাতে থাকা কাঁটা চামচের নাম বলতে পারে সঠিকভাবে কিন্তু বাম হাতে থাকা চা চামচের নাম বলতে অক্ষম হন। আবার তাকে যখন বলা হয় “আপনার হাতে কোন কোন বস্তু ছিলো?” তখন তিনি ঠিকই উভয় বস্তুকে শনাক্ত করেছিলেন। অর্থাৎ উভয় বস্তুর প্রতিবিম্বই তার মস্তিষ্কে তৈরী হয়েছিলো, কিন্তু তিনি শনাক্ত করতে পারেননি। এই কেইসগুলো সাধারণ মনে হলেও একটু চিন্তা করে দেখুন তো, এগুলো কিন্তু চেতনা-আত্মা-রুহ সম্পর্কিত আমাদের ধারণার উপর প্রশ্ন তোলে। চেতনা যদি আত্মা নামক আলাদা সত্ত্বাই হবে তাহলে করপাস ক্যালোসামের উপর আমাদের আচরণ কী আদৌ নির্ভর করত? বাম চোখ দিয়ে পর্যবেক্ষিত তথ্য বাম হেমিস্ফিয়ারে পৌছাচ্ছে না বলে কি আমরা তা শনাক্ত করতে অক্ষম হতাম? ডান চোখে দেখা বস্তুর তথ্য ডান হেমিস্ফিয়ারে পৌছাচ্ছে না বলে কি আমরা সেটা বাম হাত দিয়ে আঁকাতেও পারবনা? তাহলে আত্মার ঠিক ফাংশন কি থাকলো আমাদের শরীরে? ভাবুন, প্রশ্ন করুন, উত্তর খুঁজুন।

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *