আমরা সবাই নক্ষত্রের সন্তান

আমরা সবাই নক্ষত্রের সন্তান
আমরা সবাই নক্ষত্রের সন্তান

১৯৮০ এর দশকে আমাদের মহাবিশ্ব নিয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি টিভি সিরিজের সম্প্রচার করা হতো৷ Cosmos: A Personal Voyage নামক সেই টিভি সিরিজের উপস্থাপক ছিলেন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী “কার্ল স্যাগান”। বিজ্ঞান সম্পর্কিত ডকুমেন্টারি’র জগতে এই টিভি সিরিজকে সর্বদা একটা মাইলস্টোন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। সেখানেই এক পর্বে কার্ল স্যাগান শতাব্দীর সবথেকে বিখ্যাত এবং অর্থবহ কথাটা বলেছিলেন।

The cosmos is within us. We are made of star-stuff. We are a way for the universe to know itself. Even through your hardest days, remember we are all made of stardust.

আমরা সবাই নক্ষত্রের সন্তান, আমরা সবাই সৃষ্ট হয়েছি নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে, আমরা নিজেদের অজান্তেই একদল নক্ষত্রের মৃত্যু পরবর্তী স্মৃতি বহন করে চলেছি। সেই সিরিজের অন্যান্য সব আলোচনার তুলনায় স্যাগানের এই একটা কথাই দর্শক এবং শ্রোতাদের যুগব্যাপী ভাবিয়েছে, এখনও ভাবাচ্ছে। আজকে কার্ল স্যাগানের মহান এই উক্তির ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির তিকতালিক।

আমাদের শরীর আসলে কী দিয়ে তৈরী? জীববিজ্ঞানের ভাষায় হতো বলা যাবে প্রচুর আমিষ, শর্করা, স্নেহ আর পানি? কিংবা রসায়নের ভাষায় অ্যামাইনো এসিডই মুখ্য ভূমিকায়, সাথে রয়েছে গ্লাইকোজেন, লিপিড প্রভৃতি। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় আমাদের শরীরে রয়েছে হাইড্রোজেন (৯.৫%), অক্সিজেন (৬৫%), ফসফরাস (০.৬%), ক্যালসিয়াম (১.৩%), কার্বন (১৮.৫%) ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এসব উপাদান আমাদের শরীর কিভাবে পেল? বা, কোথা থেকে এলো এসব উপাদান? সবাই প্রথমেই ভাববেন, আমরা যে খাবার খাই, তা থেকে। তাহলে এই খাবারেই বা এসব উপাদান কোথা থেকে এলো ? উত্তর হবে, মাটি থেকে তথা পৃথিবী থেকে। এই পৃথিবী আবার এসেছে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পরবর্তী ফলাফল হিসেবে। মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিলো প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে। বিগ ব্যাং পরবর্তী কিছু সেকেন্ডের মধ্যেই প্রোটন এবং নিউট্রন তৈরী হয়ে গিয়েছিলো। এসময় মহাবিশ্ব খুব দ্রুত হারে ঠান্ডা হচ্ছিলো। বিগব্যাং পরবর্তী ৩-২০ মিনিট সময়কালকে বলা হয় “বিগব্যাং নিউক্লিওসিনথেসিস”, এসময় প্রচণ্ড হারে নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটে এবং উৎপন্ন হয় হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম। মহাবিশ্বের প্রায় ৭৫% হাইড্রোজেন এবং ২৫% হিলিয়াম দ্বারা পূর্ণ ছিলো। এই নিউক্লিওসিনথেসিস চলাকালে আরও সৃষ্টি হয় লিথিয়াম এবং বেরিলিয়াম যেখানে বেরিলিয়াম ভেঙে আবার লিথিয়ামে পরিণত হয়। শেষ। এটুকুই ছিলো বিগব্যাং এর ফিউশন। এগুলো সৃষ্টি হতে হতেই মহাবিশ্ব এত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো যে আর ফিউশন ঘটা সম্ভব হয়নি। তাহলে আজকের এত এত মৌল কীভাবে সৃষ্ট হলো? এই মৌল সৃষ্টির কারণ “স্টেলার নিউক্লিওসিনথেসিস”।

“বিগব্যাং নিউক্লিওসিনথেসিস” এর পর বেশ খানিকটা সময় কেটে গেলো। সময়ের সাথে সাথে, এই হাইড্রোজেন-হিলিয়াম গুচ্ছাকারে একত্রিত হয়ে নক্ষত্র তৈরি হলো এবং সেখানেই পুনরায় শুরু হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন। নক্ষত্র সৃষ্টির, এর মধ্যে ফিউশন হওয়ার মেকানিজমসহ বিস্তারিত আলোচনা পূর্বে আমরা করেছি। সেখানে যে চক্রেই ফিউশন হোক না কেনো হালকা মৌল থেকে ভারী ভারী মৌল তৈরি করতে থাকে। তো ছোট নক্ষত্রগুলোর কোরে প্রধানত হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরি হয়। কিন্তু বিশাল ভরের নক্ষত্রগুলোর মধ্যে আরও জটিল প্রতিক্রিয়া চলে, যেখানে কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, সিলিকন, সালফার, লোহা ইত্যাদি ভারী মৌলও গঠিত হয়। নক্ষত্রের জীবনচক্রের এক পর্যায়ে, যদি সেটি বিশাল ভরের হয়, তবে এটি এক সময় সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাশূন্যে সমস্ত ভারী মৌল ছড়িয়ে দেয়। এরপর, এই ছড়িয়ে পড়া মৌলগুলো একত্রিত হয়ে নতুন নীহারিকা তৈরি করে, যা থেকে জন্ম নেয় নতুন নক্ষত্র ও গ্রহ। আমাদের সৌরজগত তথা পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহগুলোও এমনই এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমানে আমাদের পৃথিবীর উপাদানগুলো সেই সৌর নীহারিকা থেকেই এসেছে। সেখান থেকে গঠিত হয়েছে আমাদের ভূত্বক, মহাসাগর, বায়ুমণ্ডল, এবং অবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস “প্রাণ”। জীবজগতের মৌলিক রাসায়নিক উপাদান যেমন কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, আয়রন— এসব সবই সেই মহাজাগতিক বিস্ফোরণেরই ফসল। আর এটাই রহস্য আমাদের নক্ষত্রের সন্তান হয়ে ওঠার। এই একটি বাক্যই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের অস্তিত্ব কেবল একটি রসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল নয়; এটি এক মহাজাগতিক যাত্রার অংশ, যা শুরু হয়েছিল অনন্ত অতীতে এবং চলতে থাকবে অনন্ত ভবিষ্যতে। আমাদের দেহের প্রতিটি পরমাণু একসময় কোনো এক নক্ষত্রের কেন্দ্রস্থলে গঠিত হয়েছিল, কোনো এক সুপারনোভার বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়েছিল মহাবিশ্বের বুকে। আবার মৃত্যুর পর হয়তো কোনো একসময় ফিরে যাবে অন্য কোনো এক নক্ষত্রের কেন্দ্রে।

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *